আমি বাংলাদেশে
প্রথম নারী কারাতে ব্ল্যাক বেল্ট ধারী,
প্রথম নারী আন্তর্জাতিক ভেটেরান কারাতে পদকজয়ী,
প্রথম UNESCO ICM প্রতিনিধি,
৫ বার জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়ন,
কোচ, উদ্যোক্তা, মনোবিদ, লেখিকা, প্রকাশিত গবেষক।
ভাবতে পারেন এটাই অনেক?!
না... না... আমি আরও অনেক বেশি হতে পারতাম,
বিশ্বকে আরও ভালোভাবে সেবা করতে পারতাম!
আমার সেই সম্ভাবনা ছিল, সেই জ্বালা ছিল ভিতরে।
তাহলে কি হলো?!
চলুন একটি গল্প বলি।
আমার পরিবার গঠিত হয়েছে এমন সব পথপ্রদর্শক মানুষে যে,
ভাবা হয়েছিল তাঁদের পথই অনুসরণ করব আমি ।
ডাক্তার ও অধ্যাপক ভাই বোনের পরিবারে আমি বড় হয়েছি।
৬ ভাইবোনের মাঝে একজনও প্রকৌশলী নেই বলে, আমাকে একজন প্রকৌশলী হিসেবে আশা করা হয়েছিল।
কি, নিশ্চয়ই শুনতে পরিচিত লাগছে?!
কিন্তু আমি বিদ্রোহ করলাম !
চুপি চুপি কারাতে চর্চা করে, ৫ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে,
ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করে,
আমি 'কমব্যাট জিম' নামে একটা ফিটনেস সেন্টার শুরু করলাম।
দুই দশকের বেশি সময়ে ১১ হাজারেরও বেশি সদস্যকে সেবা দিয়েছি—
অসুস্থকে করেছি সুস্থ, বৃদ্ধকে করে তুলেছি তরুণ।
কিন্তু জানেন, ভাগ্যের পরিহাস কেমন?
২০০৩ সালে,
আমার একমাত্র সন্তান লিও’র জন্ম দিতে গিয়ে
একটি জিনগত অসুখ, যা অন্তঃসত্ত্বাকালে বৃদ্ধি পায়,
আমার জীবনকে মৃত্যুঝুঁকিতে ফেলে দিল,
আমাকে শৃঙ্খলে বাঁধল।
কিন্তু আমি কখনো হাল ছাড়িনি, কখনো লড়াই থামাইনি, বরং এগিয়ে গেছি।
যখন নিজেকে সাহায্য করতে পারিনি, অন্যদের সহায়তা করেছি।
ফলে জিম চালানোর পাশাপাশি
টিভি স্বাস্থ্য অনুষ্ঠান, কর্মশালা, কোচিং ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে
আমার অলাভজনক কার্যক্রম চালিয়ে গেছি,
বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে আপডেট রেখেছি।
তবে আমার সময় ফুরিয়ে আসছিল।
আচ্ছা বলুন তো, এক বছরে কয়টি মাস?
১২ মাস?
ভুল!
কমপক্ষে আমার ক্ষেত্রে নয়।
আমার বছরে ছিল ৯ মাস কাজ আর বেঁচে থাকার জন্য,
আর বাকি ৩ মাস কাটতো
EVL, স্ক্লেরোথেরাপি, হেমাটেমেসিস, মেলেনা, তীব্র জন্ডিস, অ্যানিমিয়া, রক্তদাতা খোঁজা, ব্যয়বহুল অ্যান্টিবায়োটিক, দীর্ঘ হাসপাতাল থাকা,
এবং প্রতিবার স্টেন্ট পরিবর্তনের আগে পরে নানা জটিলতা সামলাতে—
এবং তা প্রতি বছর !
যেমনই হতাশাজনক হোক, আমি লড়াই চালিয়ে গেছি।
কিন্তু এক পর্যায়ে আমার চিকিৎসকরাও ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।
আমার নিয়মিত ডাক্তার একদিন স্বীকার করে বললেন,
"আমি ৩০ বছর ধরে ERCP করছি,
কিন্তু এক রুগীর উপর এতবার করিনি, এ রোগে এতদিন কেউ টিকে থাকে নি ।"
এরপর ১ বছরের ব্যবধান ১০ মাসে নামল,
তারপর ৯, ৬...
এক পর্যায়ে আমাকে প্রতি ২ মাস পর পর স্টেন্ট বদলাতে হতো।
এটি চরম অসহনীয় হয়ে উঠেছিল,
শারীরিক ক্ষতি তো বটেই,
পেশাগত, আর্থিক, সামাজিক, মানসিক—সব দিক থেকেই ক্ষতি হচ্ছিল।
“Fall down seven times, get up eight”—জাপানি বুশিদো-এর এই উক্তি মেনে,
প্রতি পতনের পরও আমি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি,
যদিও ভিতরে ভিতরে সব ক্ষয়ে যাচ্ছিল।
'ডোমিনো প্রভাব' এর মত, এক ক্ষতি আরেকটিকে ডেকে আনছিল।
দীর্ঘ এই সময়ে, আমার পোর্টাল ভেইন থ্রম্বোসিস থেকে
পোর্টাল কোল্যাটেরাল, স্প্লিনোমেগালি, ইসোফেজিয়াল ভ্যারিসেস, হেপাটোমেগালি, আমবিলিকাল হার্নিয়া, বাইল ডাক্ট সরু হয়ে যাওয়া (মেটাল ও প্লাস্টিক স্টেন্ট প্রয়োজন), এবং গলব্লাডার ফেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটল।
অবশেষে, লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ছাড়া উপায় রইল না,
যার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত ছিল।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষামূলক অপারেশনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে,
উল্টো ঘুরে, আমি আমার দীর্ঘপ্রতীক্ষিত স্বপ্নকে অনুসরণ করলাম।
২০২২ সালে,
লাস ভেগাস, যুক্তরাষ্ট্রে আমি বিশ্বে সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যবাহী কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিলাম,
প্রমাণ করলাম বয়স কেবল একটি সংখ্যা,
প্রথম বাংলাদেশি নারী আন্তর্জাতিক ভেটেরান কারাতে পদকজয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লাম,
প্রথম "মা-ছেলে" জুটি হিসেবে একই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়,
আমি আর লিও, ৩টি পদক জিতলাম, দেশের সম্মান উঁচু করলাম।
এরপর,
আমি UNESCO ICM-এ প্রথম ও একমাত্র বাংলাদেশি প্রতিনিধি হলাম,
দক্ষিণ কোরিয়ায় বার্ষিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমার গবেষণাপত্র উপস্থাপন করলাম।
পরে, UNESCO-র ৫ম মার্শাল আর্টস 'রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ ফর এক্সপার্টস' এ আমার রিসার্চ পেপার প্রকাশিত হলো।
সুখ যেন চারিদিকে ছড়িয়ে ছিল।
কিন্তু সিনেমার মতোই, ঠিক তখনই ভিলেন প্রবলভাবে হাজির হল!
২০২৩ সালে আমি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লাম।
আমাকে বাংলাদেশের হাসপাতালে নেওয়া হল,
সেখানে ডাক্তাররা বিফল হয়ে পরামর্শ দিলেন জরুরিভিত্তিতে সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডে যাবার,
সেখানেও সমাধান না পেয়ে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের জন্য পাঠালো হায়দ্রাবাদ,
তারপর দিল্লিতে।
ব্যায়ামের ট্রেনিং আর বেড়ানোর কারনে আমি এ পর্যন্ত ১৭টিরও বেশি দেশ ঘুরেছি,
কিন্তু এই প্রথম আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বিমানবন্দরে যেতে হল,
শুধু পরনের পোশাক, বিশাল সব মেডিক্যাল রিপোর্ট,
এবং গলব্লাডার থেকে বেরিয়ে আসা একটি লম্বা নলসহ।
প্রত্যেক জায়গায়, প্রত্যেক ধাপে,
প্রতি ডাক্তার নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন,
শেষে সকলেই নিস্ফল হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
অর্ধেক বছর চলে গেল।
শহর থেকে শহরে, হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে।
এক পর্যায়ে, সবাই আশা ছেড়ে দিল।
আমাকেও হাল ছাড়তে বলে, একা ফেলে,
তারা সবাই দেশে ফেরত চলে গেল।
উচ্চ বিলিরুবিন, ফাটা গলব্লাডার, পারকুটেনিয়াস কোলেসিস্টেক্টমি ড্রেইনসহ,
অসহনীয় ব্যথায়, শীর্ণ শরীরে, বেঁচে থাকার আকুতিতে,
মরিয়া হয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, "এখন কী?"
ডাক্তাররা হাসিমুখে বলল,
"কিছুই করার নেই"।
আমাকে যেন প্রস্তুত হতে বলল অনিবার্য মৃত্যুর জন্য।
আমি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলাম।
দেশের ফিরতি টিকেট কিনে নিলাম।
কিন্তু হঠাৎ, আমার অন্তরের গভীরে এক প্রবল রাগ জেগে উঠল।
আমি অনুভব করলাম সমস্ত সীমাবদ্ধতা, প্রতিটি বাধা, আমি ভেঙ্গেচুরে, পুড়িয়ে ফেলতে চাই।
সন্তানের চোখের দিকে তাকিয়ে,
শেষবারের মতো চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
যখন সবাই আমাকে ছেড়ে গিয়েছিল, আমি দৃঢ় থেকেছি।
সব প্রতিকূলতা, সমস্ত বাধা ভেঙে,
আমি সামনে এগিয়েছি।
ব্যায়ামের অনুশীলন চালিয়ে গেছি, ওজন তুলেছি, নিজেকে তুলেছি,
বিশ্বাস রেখেছি কোনো একদিন, কোনো না কোন ভাবে,
একটা দারুণ সমাধান বেরিয়ে আসবেই,
আর তার জন্য আমাকে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
"আমার মা কি সুস্থ হয়ে যাবেন?"
"না, শুধু সুস্থ হবেন না,
আগের থেকেও সুস্থ, আগের থেকেও শক্তিশালী হবেন!"
বাংলাদেশের ফিটনেস অঙ্গনে,
আমি ভালোবাসার সাথে 'ওয়ান্ডার ওম্যান' নামে পরিচিত।
আমার আঙুলে 'ওয়ান্ডার ওম্যান' ট্যাটুও আছে।
আমি হাল ছাড়ার মানুষ নই !
আমার প্রিয় কবি জালালউদ্দিন রুমির একটি লাইন দিয়ে শেষ করতে চাই—
"You were born with wings,
why prefer to crawl through life?"
Be Unstoppable.
শামীমা আখতার তুলি
জানুয়ারি, ২০২৫